★অনুযোগের তিমিরে★
এই সংসারে তোমার ভূমিকা কি শুধু খাওয়া আর ঘুমানো।রোজগার করতে হয় না। কোন টেনশন নাই।তারপরও আমার ছোট ছোট কাজগুলো সময়মত করে রাখতে পারো,না?আমার সেবা করতে তুমি এত গাফেল?
জানো না স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত!
তুমি কোন জাহান্নামে যাবে আল্লাহই জানে।
আমাদের পুরুষ শাসিত সমাজের নিত্য চিত্র এটি।
ইসলাম কখন বললো,স্ত্রী স্বামীর সেবায় ব্রত না হলে সে জাহান্নামি হবে। ইসলামে মা-বাবার সেবার কথা বলা হয়েছে জোরালো ভাবে।
সকাল থেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত
একটি সংসারের সব কাজ কর্ম আপনাকেই করতে হবে।যদি শ্বশুর বাড়ির সদস্য থাকে যতজন থাকে সবার দায়িত্ব আপনার!
রোদ বৃৃষ্টি যাই হোক আপনার সন্তানের স্কুল এবং কচিং এর সামনে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকার কাজটা কিন্তু আপনার!যদি কখনো বাচ্চার রেজাল্ট খারাপ হয় তার দায় ভারও আপনারই।
বাসার প্রত্যেকের খাওয়া-দাওয়া,ঘুম,
অসুখ বিসুখ সব কিছুর বিষয়ে আপনাকই সব বুঝে নিতে হবে।
অথচ আপনিও মানুষ, আপনার অসুখ হতে পারে কিন্তু হলে কারো কিছু করার থাকে না।বরং অসুখ নিয়ে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের খাবার আপনাকে তৈরি করতে হবেই।
আপনি মরেন আর বাঁচেন এটা বাধ্যতামূলক!
আপনার একটা দিন রেস্ট নেয়ার অধিকার নেই।
রান্নার শেষে পরিবারের সবাইকে খাওয়ানোর পর ঘরের বউকে খেতে হয়,হাড়ির তলার খাবার।
আর যদি এর ব্যতিক্রম হয় তাহলেই এই বউ ভালো না।এই বউ সংসারের নিয়ম কানুন মানে না।এই বউ এর জন্য সংসারে উন্নতি হয় না। বউ একটা অলক্ষি। সবার সাথে খেলে বা সম পরিমাণ খেলে বউ রাক্ষসী বা পেটুক!
এই পেটুক নরকেও ঠাঁই পাবে না!
এটা আমাদের তথাকথিত সমাজের প্রায় প্রতিটি পরিবারের চিত্র।
ইসলাম কি এই নিয়ম বেঁধে দিয়েছে বউ কখনো আগে খেতে পারবে না, অসুস্থ হলেও তাকেই সব করতে হবে? ইসলাম পারিবারিক এই অসমতাকে কখনোই সাপোর্ট করেনি।
এবার চিত্রটাকে একটু পালটে দেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাশুড়িরা অবহেলিত হয়। তা কখন?
যখন কর্তৃত্বটা বউ এর হতে চলে যায়।জল্লাদ ননদ গুলোর বিয়ে হয়ে যায়।
ঐ যে নতুন বউ তার প্রথম লাইফে শ্বশুর বাড়ির সদস্য কর্তৃক যে ব্যবহার প্রাপ্ত হয় তা পরবর্তীতে সে,এপ্লাই করতে শুরু করে।কারণ সে ও তখন শাশুড়ি হওয়ার দ্বারপ্রান্তে!
একজন মেয়ে যখন মাব-বাবা,ভাই-বোন সবাইকে ছেড়ে শ্বশুর বাড়ি যায় তখন স্বামীর বাড়ি গিয়েই কিন্তু সবার সাখে খরাপ আচরণ করে না সে। হউক সে শিক্ষিত বা মূর্খ!
ঐ বাড়িতে সে যা প্রথম থেকে শিখে ঠিক তা ই পরবর্তীে প্রয়োগ করে।
অথবা বলা যায়,' টিট ফর ট্যাট' এই নীতি প্রয়োগের ট্রাই করে।
একজন নারীর যদি শ্বশুর বাড়ি ভাগ্য মন্দ হয় তবে তা সবদিক থেকেই হয়। অথাৎ স্বামী থেকে শুরু করে সে পরিবারের সবাই ঐ নারীর জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে।নুন থেকে চুন খসলেই শেষ! উঠতে দোষ বসতে দোষ! তখন বিষয়টা এমন দাঁড়ায় যে, দুনিয়ার জাহান্নামের চিরস্থায়ী বাসিন্দা সে!
মজলুমের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেঁকে যায় তখন সে প্রতিঘাত করে যা প্রতিটা আঘাতেরও শতগুণ বেশি হয়। আর সেই ফল ভোগ করে শাশুড়ির কর্তৃত্ব যখন বউয়ের নিকট চলে যায়।
এ প্রসঙ্গে একটি গল্প বলি:
এক স্বামী প্রতিনিয়তই তার স্ত্রীকে বকাঝকা করে অতিষ্ঠ হয়ে নিজেই নিজের উপর বিরক্ত হয়ে একদিন এক সাইকিয়াট্রিস্ট এর চেম্বারে গেলো।
- সাইকিয়াট্রিস্ট: পেশা কী আপনার?
- ভদ্রলোক: আমি চাকরিজীবী ।
- সাইকিয়াট্রিস্ট: আপনার স্ত্রী কী করেন?
- ভদ্রলোক: সে কিছু করে না, গৃহিণী।
- সাইকিয়াট্রিস্ট: তাহলে কি করেন তিনি?
- বললাম তো সে কিছুই করে না।
- ঘুম থেকে কয়টায় ওঠেন আপনার স্ত্রী?
- ভোর পাঁচটার দিকেই উঠে যায়।
- সাইকিয়াট্রিস্ট: এত সকালে উঠে কি করেন তিনি?
- ভদ্রলোক বল্লেন,ঘরদোর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করেন।
থালাবাটি ধুয়ে সকালের নাস্তা তৈরী করে এই আর কি!তেমন কিছু করে না।
- বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যায় কে?
- ভদ্রলোক: আমার স্ত্রী নিয়ে যায়, নিয়ে আসেও সে-ই। কারণ তার তো তেমন কাজ নেই।
- সাইকিয়াট্রিস্ট: বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে আপনার স্ত্রী ওখানেই বসে থাকেন?
- ভদ্রলোক: না না। ওখানে বসে থাকলে বাজার করবে কে? বাজার শেষ করে বাড়ি যায় সে, ওগুলো রাঁধে, জামাকাপড় ধোয়। আপনাকে তো বল্লামই, সে কিছু করে না।
- সাইকিয়াট্রিস্ট: সন্ধ্যায় কাজ থেকে বাড়ি ফিরে, কী করেন আপনি?
- ভদ্রলোক: বিশ্রাম নিই। কারণ, সারাদিনের কাজের ধকলে শরীর আর কুলিয়ে ওঠে না।
- সাইকিয়াট্রিস্ট: আপনার স্ত্রী কী করেন তখন?
- ভদ্রলোক: নাশতা তৈরি করে, বাচ্চাদের খাওয়ায়, আমাকে খাওয়ায়, বাচ্চাদের পড়তে বসায়, তারপর রাতের খাবার রাঁধে। রাতের খাওয়া শেষে থালাবাটি ধুয়ে, তারপর বাচ্চাদের ঘুম পাড়াতে নিয়ে যায়। এসব করতে তার সমস্যা হয় না, কারণ সে তো কোনো চাকরি-বাকরি করে না।
তার ন'টা-পাঁচটা অফিস নেই,সে কত স্বাধীন!
- সাইকিয়াট্রিস্ট: লোকটিকে এবার বললো,আপনার প্রকৃত সমস্যাটি কোথায় বলুন আমাকে। আমি কী করতে পারি আপনার জন্য?-
- ভদ্রলোক: কাজ শেষে ঘরে ফিরে স্ত্রীর বেকার জীবনের সুখ দেখে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছি জনাব। এ কি স্বাভাবিক ঈর্ষাকাতরতা? নাকি কোনো রোগ?
- সাইকিয়াট্রিস্ট: এ অসুস্থতা। এর নিরাময় খুবই সহজ, যদি আমার প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করেন।
- জী জী বলুন, প্লিজ।
- শুক্র এবং শনিবার এই দুইদিন আপনার স্ত্রী সংসারে প্রতিদিন যে কাজ গুলো করে ঠিক সেই কাজগুলোই আপনি করবেন এবং এভাবে তিন মাস।
#এর মধ্যে একমহিলা পেশেন্ট ডক্টরের চেম্বারে প্রবেশ করলো।
ডক্টর, আমার স্বামী সারাদিন খায় আর ঘুমায়, আর চ্যাটিং, ফেসবুকিং করে অথবা ইউটিউবে পড়ে থাকে।
কোনো কাজ কর্ম করে না।এর সুরাহা কি? এখানে যে আর একজন রোগী আছে সেখানে তার ভ্রুক্ষেপ নেই,পাশের চেয়ারটি তে বসতে বসতে এক নি:শ্বাসে বলে গেলো সে।
- এবার মনোডা. ভদ্রলোককে বিদায় জামিয়ে ভদ্রমহিলার কথা মনোযোগ দিলেন।
- জি বলুন
- ভদ্রমহিলা রিপিড করলেন কথাগুলো।
#ভদ্রলোককে বিদায় জাননোর পরও সে বসে রইলো।আর মহিলার কথা গুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছেন আর ভাবছেন আহা! বেকার স্বামীর কবলে সুন্দরী মহিলাটি কত কষ্টেই না আছে।
-ডা. মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন আপনার স্বামী কি কাজ করে?
-কিছু করে না, ঘর জামাই।
-ডা. তিনি কখন ঘুম থেকে উঠেন?
- সকাল পাঁচটায়
- ডা. তারপর কি করে?
- ছাদে যায় ব্যায়াম করে,কোনো কাজ না থাকলে যা হয়। তারপর ছাদের গাছ গুলোতে পানি দেয়। এরপর নিচে এসে বাবুর টিফিন তৈরী করে। ওকে নাস্তা করায়,নিজে নাস্তা করে,বাবুকে স্কুলে দিয়ে,নিজের কোনো কাজ নেই,সেজন্য ন'টা পাঁচটা বাবার বিজনেজ দেখে। অফিস থেকে ফিরে এসে ফ্রেস হয়ে আমাদের দুজনের জন্য কফি তৈরী করে।এরপর বাবুকে হোমওয়ার্ক করায়।বাবুকে রাতে খাইয়ে ঘুম পারিয়েই শুরু হয় নেট ওয়ার্কিং। বেকার থাকলে যা হয় ডক্টর!
মহিলা ননস্টপ কথাগুলো বলে গেলেন।
#ভদ্রলোক সুন্দরী মহিলার রুপে মসগুল হয়ে কত আফসোসই না করছিলেন এতক্ষণ তার জন্য। এবার তার কথায় যথারীতি ঘামতে শুরু করলো।
- ড. আর সারাদিন আপনি কি করেন?
- আমার কাজের কি শেষ আছে ড.?
বুয়া আসে,সারাক্ষণ তার সাথে থাকতে হয়,না হলে যে ফাঁকিবাজ!
বুয়া সমস্ত কাজ করে চলে যাওয়ার পর খাওয়া দাওয়া সেরে,এই,,একটু বলেই আমতা আমতা শুরু করলো।
- ডা.জীঁ বলুন।
- এই একটু স্টার প্লাস দেখি। বেশি দেখি না।এরপর তো ঘুমিয়ে যাই। ও অফিস থেকে এসে আমার ঘুম ভাঙায়।
এবার ভদ্রলোক উঠার জন্য তাড়া দেখালেন, আর মনে মনে ভাবলেন, মানুষ সুখে থাকলে কতই না ভুতে কিলায়! নিকুচি করি এই সুন্দরীর!
যে-কাজে অসুস্থতার ছুটি নেই, যে-কাজে সাপ্তাহিক বন্ধ নেই, যে-কাজে দৈনিক ৮ ঘণ্টার নিয়ম নেই, যে-কাজে রাতদিন ২৪ ঘণ্টা অন-কল হাজিরা দিতেই হয়, সেই সনদ-বিহীন কাজটির সাহায্য পেয়েই আমরা প্রত্যেকটি মানুষ আজ এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি জীবনে।অথচ আমরা এর মূল্যায়নই এতদিন করিনি!
নিজের ভুল গুলো বুঝতে দেরি হলো না ভদ্রলোকের। ড. এর ফি মিটিয়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন। আর এ পথ মাড়াননি কখনো। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন,আর অনুযোগের তিমিরে হারাবেন না তিনি।
৩১.০৮.২০২৭
Comments
Post a Comment