★যৌতুক ব্যধি★
বিয়ের পর স্ত্রী তার বাবার বাড়িতে যেতে চাইবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাবেন কিনা, এই সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে বারবার তাকে বলবেন ‘মাকে জিজ্ঞেসা করো’, স্ত্রীকে নিয়ে বাইরে যাবার আগে বাবার অনুমতি নিতে হবে।আপনার সাময়িক মনে হতে পারে কোনো অসুবিধা তো হচ্ছে না। কিন্তু, আপনার স্ত্রীর মনে প্রতিনিয়ত ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে। আপনার রোজগারের পুরো টাকা তুলে দিচ্ছেন মা বাবা কিংবা বোনের হাতে। স্ত্রীকে নিয়ে কোথাও যাবেন কিংবা ডক্টরের কাছে যাবেন বা মাঝেমধ্যে তার কিছু ইচ্ছে করলে আপনি বলেন- “দেখি মা কী বলে।” তখন হয়তো আপনার স্ত্রী হয়তো আপনাকে কিছু বলে না। কিন্তু, আপনার মা যদি না করেন, মায়ের ওপর তো বটেই বরং আপনার উপরও তার রাগ হয়। তখন মা,বা বোন টাকা দিলে স্ত্রীকে নিয়ে ডক্টরের কাছে যাবেন বা ইচ্ছে পূরন করবেন অন্যথায়, তার ইচ্ছে গুলো অনাদরে শুকিয়ে পড়ে থাকবে।
আপনি পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অবশ্যই মা-বাবার পরামর্শ নিবেন, তাদেরকে শ্রদ্ধা করবেন। কিন্তু, স্বামী হিসেবে আপনার যে কর্তৃত্ব আছে, সেই কর্তৃত্বের চর্চা আপনিই করুন; আপনার মা-বাবাকে করতে দিবেন না। স্ত্রীর কোনো আবদার নাকচ করতে চাইলে তাকে বুঝিয়ে আপনিই নাকচ করুন। নিজের মা-বাবাকে ইনভলভ করে যখন দাম্পত্য জীবনের সিদ্ধান্ত নিবেন, কোনো এক সিদ্ধান্ত ভুল হলে স্ত্রী আপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
যাইহোক একটি সত্যি ঘটনা তুলে ধরলাম,
কোনো এক ডাক্তার নারীর রাতুল নামের একজন অপদার্থ স্বামী ছিল।বিয়ের কয়েক দিন পর থেকেই যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে কথা শোনাতে লাগলো। অবশ্য বিয়ের দিন রাতেই রুম খালি করে রেখেছিল, ভেবেছিল শ্বশুর বাড়ি থেকে ফার্নিচার যাবে। কিন্তু কোনো ফার্নিচার যায়নি বলে বৌভাত অনুষ্ঠানে বর পক্ষের কোনো মহিলারা কনে পক্ষের কারো সাথে কথা বলেনি।এমনকি বরের বাবাও কনের বাবাকে বসিয়ে খাবার খওয়ায়নি বা যত্ন আত্মি করেনি। এই সিচুয়েশনে কনের বাবা, না খেয়েই বরের বাড়ি থেকে ফিরে গেছে। কনের ভাই লন্ডনে আর্মি অফিসার, সে তার বোনের বিয়ে উপলক্ষে দেশে এসেছে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই সে এই দেশের বিয়েগুলোতে যৌতুক প্রথা সম্পর্কে অবগত নয়। বাবা না খেয়ে চলে গেছে বিধায় সেও না খেয়ে বর কনে ও নিজেদের গুটি কয়েক আত্মীয় স্বজন যারা গিয়েছিল তাদের নিয়ে বরের বাড়ি থেকে ফিরে এসেছে।
বউ ভাত অনুষ্ঠানের ২ বা ৩ দিন পর বরের বাড়ি থেকে কিছু লোক এসে বর কনেকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যায়।কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে বলা হলো ওদের বংশ অনেক বড় তাই ২০০ লোক আসবে। যেহেতু ফ্ল্যাট বাড়িতে এত লোক যায়গা হবে না তাই কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠান করতে হবে।
কনের বড় বোন বললো, এটা কি বিয়ের অনুষ্ঠান নাকি? এত লোক কেন আসবে?এরপর তারা লোক কমিয়ে অর্ধেক এ এলো। এরপর বললো, যদি কমিউনিসেন্টারে তারা না যায় তাহলে বাসার গ্যারেজে প্যান্ডেল টানিয়ে, লাইটিং করে, বরকে খাশি দিয়ে সাগরআনা সাজিয়ে সব এরেঞ্জ করতে হবে। তাদের সাথে কথার বনিবনা না হওয়ায় 'বর' প্রায় ২০ দিন কনের বাড়িতে অবস্থান করেছিল। আর প্রতি বেলায় তাকে পোলাও, মাংস, বিরিয়ানি খাওয়াতে হতো।
কনের মা ছেলেকে ৫০০০ টাকা দিয়ে বললো, তুমি বাইরে থেকে ঘুরে আসো, তোমার যা ইচ্ছে হয় তুমি কেনাকাটা করো। কনের রুমে এসি ছিল না অনেক গরম পড়ায়, কনের মা ৮০ হাজার টাকা খরচ করে কনের রুমে এসি লাগিয়ে দিলো যেন নতুন জামায়ের কষ্ট না হয়। বৌভাতের পর বর কনের বাড়িতে এলে পরের দিন সকালে বাজার করে বলে জানি। কিন্তু এখানে উল্টো শাশুড়ী নতুন জামাইকে টাকা দিয়ে মার্কেটে পাঠায় তার পছন্দ মত কেনা কাটা করার জন্য। আর জামাই মিয়া মার্কেটে গিয়ে নতুন পাঞ্জাবি, শার্ট,জুতা কিনে নতুন বউয়ের টাকায়। শাশুড়ির দেয়া টাকা তার পকেটে গচ্ছিত রেখে দেয়। যেহেতু কনে ডক্টর তার কাছে সবসময়ই টাকা থাকে। আরেকটি কথা হলো কনে চাইলে নিজেই বরের বাড়িতে চার, পাঁচ লক্ষ টাকার ফার্নিচার নিতে পারতো। যেহেতু ইন্টার্নি শেষ হওয়ার পর পরই চাকরিতে জয়েন করেছে এবং নিজেে চেম্বার দিয়েছে। কিন্তু আত্ম মর্যাদা খুব প্রখর হওয়ায়,যৌতুক সেচ্ছায় বয়কট করেছে। এই সামাজিক ব্যধি থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চেয়েছে। নিজের বাবাকে বলেছে যখানে বিয়ে দিচ্ছো তাদের বাড়িতে কি ফার্নিচার নেই? যদি না থাকে ও বাড়িতে গিয়ে মাদুর পেতে ঘুমাবো। তবুও কোনো ফার্নিচার যাবে না যদি যায় তবে ও বাড়িতে আমি যাবো না।
বিশদিন থাকার পর বর একাই ফিরে যায়। প্রায় দের মাস পর ওদের এলার চেয়ারম্যান ও কনের ক্লিনিকের এমডির সহায়তায়,, তাদের দায়িত্বে কনেকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়। আর নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় নতুন পরিকল্পনা। কনেকে কোথাও চাকরি করতে দেবে না। ইবনেসিনার যাত্রাবাড়ির ব্রাঞ্জে অনেক আগেই সিভি দেয়া ছিল সেখান থেকে কল করা হলে তারা কনেকে বাড়িতে তালা বন্ধ করে রাখে। কুরবানি ঈদে কনেকে বাবার বাড়ি যেতে দেয়া হয় না বা তারা নিয়ে যায় না। যৌতুক কেন দেয়া হলো না তাই নিয়ে দেয়া শুরু করে নানাবিধ মেন্টাল শকড এবং আরও কিছু। কনে তার বাবার বাড়িতে ফোন দিয়ে জানালো আমাকে বাসায় নিয়ে যাবে নাকি আমি একাই চলে আসবো? অতঃপর কনের বাবার বাড়ির লোক কনেকে আনতে যাবে শুনে বরের মা চিৎকার চেচামেচি শুরু করলো।মেয়ের বাড়ির লোকেরা কেন যাবে। বরের বাড়ির লোকেরা ঈদে আগে বেড়াতে যাবে। কনের বাবা ঈদ উপলক্ষে দাওয়াত দিয়েছিল তারা দাওয়াত কবুল করেনি তাদের বংশের লোকজন বেশি যদি যেতে হয় ৫০ থেকে ১০০ জন লোক যাবে। যদিও আরও আত্মীয় স্বজন যেতে পারলে ভালো হত! অর্থাৎ কনের বাড়িতে যে কোনো উপলক্ষ বা দাওয়াতে তাদের ঘর এবং গুষ্টি সুদ্ধ সবাইকে যেতে হবে। যাইহোক বরের মায়ের চিৎকার চেচামেচি কে উপেক্ষা করে কনের, মা,বোন আর দুলাভাই কনেকে আনতে গেলো। কিন্তু তারা তাদেরকে ফেরত পাঠালো।আর এই শর্তে, দিবে বললো, পরবর্তী শনিবার বরের চাচার বাসায় দাওয়াত আছে তা গ্রহণ করে শুধু ২ দিনের জন্য কনের বাবার বাড়ি যাবে। সেই শর্তে, কনের বাবার বাড়ি থেকে আবার তারা আনতে গেলো এবং নিয়ে আসলো। আসার সময় কনে যে গহনা পড়ে তার চাচা শ্বশুরের বাসায় দাওয়াত খেয়েছে সেগুলো পরিধান করেই বাবার বাড়ি ফিরে এসেছে। কনের বাবার বাড়ির দেয়া গহনা সহ যাবতীয় বিয়ের অন্যান্য সব শাড়ি গহনা, লেহেঙ্গা,জুতা সবই বরের মা নিজের কাছে রেখে দিলো।
এরমধ্যে কেটেগেলো ছয় মাস। বর তার বোন, চাচাতো বোনদেরকে নিয়ে কক্সবাজার সমূদ্র সৈকত ভ্রমনে যায়। ফিরে এসে অন্য মেয়ে নিয়ে মটর সাইকেলে করে ঘুরে বেড়ায়।কনে পিজিতে এমএস এক্সাম দিতে গেলে বরের সাথে দেখা হয়ে যায়। সে কেন পিজিতে গেছে কনে তাকে জিজ্ঞেস করলে বর এড়িয়ে যায় এবং সেখান থেকে সরে পড়ে। পরীক্ষা শেষ হলে কনে তাকে অনেকবার ফোন দেয় কিন্তু সে একবারও ফোন রিসিভ করে না।
ছয়মাস অপেক্ষার পর কনে নিজ ইচ্ছায়, নিজ উদ্যোগে অপদার্থ বরের বিরুদ্ধে একটি যৌতুকের মামলা দায়ের করলো। অবশ্য কনের বোন তাকে আরও অপেক্ষা করতে বলেছিল কিন্তু কনের কথা হলো ছয় মাস অপেক্ষা করার পর মামলা করলে যে রেজাল্ট হবে ছয় বছর পর মামলা করলে একই রেজাল্ট হবে। কারণ একমাসের সংসার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের রেজাল্ট স্ব-চক্ষে অবলোকন করা হয়ে গেছে তার।
প্রথমে ৯ নাম্বার কোর্টে মামলা উঠে। দু'টা শুনানীর পর, মামলা পাঠানো হয় ২৭ নাম্বার কোর্টে। এবং এই কোর্টেই মামলা নিষ্পত্তি হয়।
৯ নাম্বার কোর্টে বিচারক রাজেশ চৌধুরী যখন প্রশ্ন করেন আপনার দেনমোহরের টাকা কত? অপদার্থ বরের উত্তর ছিল আমার আব্বু জানে। বাকি আছে নাকি সব পরিশোধ করেছেন সে উত্তরে বলেছিল, আম্মু জানে।
২৭ নাম্বার কোর্টের বিচারক রশিদুল আলম জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি সংসার করতে চান নাকি চানা না? সে তখনও কাঠগড়ায় তার পাশে থাকা মায়ের দিকে তাকাচ্ছিল।তার মায়ের নামে ওয়ারেন্ট থাকলেও তাকে এরেস্ট করা হয়নি কিন্তু আদালতে উপস্থিত হতে হয়েছিল।মামলা করার একমাস পর বরকে এরেস্ট করা হয়েছিল। এবং ছয়দিন গাড়দে ছিল। পুলিশ নাকি এরেস্ট করতে গেলেই টাকা গুঁজে দিত। এভাবে একমাস ছাড় পেয়েছিল।এটা ওদের বাহাদুরির কথা হলেও মোদ্দা কথা ছিল তখন ২০২৪ এর নির্বাচন ব্যস্ততা ছিল। পুলিশ সাময়িক ছাড় দিয়েছিল, ছেড়ে দেয়নি। যাইহোক ঐ পক্ষের উকিলের আপোষ মিমাংসার আবেদনের প্রেক্ষিতে জামিন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের ঘাড়ামির জন্য ঐ পক্ষের উকিল মিমাংসা করতে ব্যর্থ হয়।তবে উকিল সাহেব সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিল মিলিয়ে দিতে।কিন্তু অপদার্থ বর তার মায়ের দ্বারা পুরো প্রভাবিত হয়ে মূলবান একটি জীবনের ইতি টানে।
বিচারক আবারও জানতে চান, আপনার অবশিষ্ট দেনমোহর সহ তিনমাসের ভরনপোষণের জন্য কত টাকা দেবেন? সে বীরদর্পে এবার মহামান্য আদালতকে জানালো ৫০০০ টাকা।
বিচারক বল্লেন, বুঝে বল্লেন নাকি না বুঝে? বেচারা ভেবাচেকা খেয়ে অসহায়ের মত এবারও বল্লো, আব্বু জানে।
বিয়ে করেছেন আপনি আর সব কিছু জানে আব্বু আর আম্মু? এটি কেবল এজলাসে বসা বিচারকের প্রশ্ন নয় এই প্রশ্ন হাজারো নব বিবাহিত নারী সমগ্রের।
বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য যদি মা-বাবার কাছে যেতে হয়, তাহলে আপনি বিয়ে করছেনই বা কেনো?
আপনার বিয়ে করার বয়স হয়েছে মানে সিদ্ধান্ত নেবার বয়স হয়েছে। কিন্তু, বিয়ের পর প্রতিটি সিদ্ধান্ত যদি মা-বাবাকে জিজ্ঞেস করে নিতে হয়, তাহলে আপনি স্বামী হিসেবে স্ত্রীর কাছে মর্যাদা হারাবেন। এভাবে হাজারো সংসার ভেসে যাবে আব্বু আম্মুর অজ্ঞতার, মূর্খতার সিদ্ধান্তের রসাতলে। এসব সিদ্ধান্তে ফল নেতিবাচকই হয়।
Comments
Post a Comment