★বাংলার নারী★
বাঙালি অনেক নারী আছে যারা, বাজার থেকে চালের বস্তা আনার পর রান্নার সময় মেপে মেপে যখন চাল নেন রান্নার জন্য তখন সেখান থেকে এক মুঠ চাল অন্যত্র সরিয়ে রাখেন।
মাছ মাংসের ক্ষেত্রেও তাই। বাজার থেকে মাছ মাংস আনলে এক টুকরো বা দুই টুকরো করে আলাদা করে ফ্রিজে রেখে দেন।
ঈদের সময় ঈদের শপিং করার জন্য টাকা দেয়া হলে তিন ভাগের এক ভাগ টাকা রেখে দেন নিজের কাছে। আর দুই ভাগ টাকা দিয়ে ইদের শপিং করেন।
আবার অনেক নারী আছে যারা স্বামীর পকেট কাটেন। এইকাজগুলো একসময় নারীরা করতেন কিন্তু কেন?
চালের বস্তা যখন শেষ হয়ে যেতো বা কোনো কারণে চাল আনতে দেরি হত নারী তখন সেই মুঠো জমানো চাল রান্না করতেন।
জখন স্বামীর কাছে বাজার করার পয়সা থাকতো না তখন ফ্রিজের কোনে রাখা মাছ, মাংশের পুঁটলি বের করে বিরিয়ানি রান্না করে ঘরের সবাইকে খাওয়াতো।
যখন সন্তানের বেতন, পরীক্ষার ফি দিতে বাবা কোনো কারণে দিতে সাময়িক ভাবে অক্ষম হয় বা বাসায় কেউ অসুস্থ হয় তখন ঐ পকেট কাটা জমানো টাকাগুলো, ঈদের শপিং থেকে জমানো গচ্ছিত টাকা গুলো অবলীলায় বের করে দিতেন।
শুধু তাই নয় একজন ম্বামীর চাকরি না থাকলে বা কোনো ব্যবসা দাড়ঁ করাতে চাইলে বা কোনো জমি ক্রয় করতে চাইলেও ঐ গচ্ছিত টাকাগুলো কিন্তু বিনা বাক্যে স্বামীর হাতে তুলে দেন।
একজন চব্বিশ ঘণ্টা সংসারের পিছনে ছুটে চলা নারীর পক্ষে লাখ লাখ টাকা দেওয়া চাট্টিখানি কথা না।
নারীর এমন অনেক অবদান রয়েছে আমাদের সংসারের পিছনে। একটি গল্প মনে পড়ে গেলো, ঠিক কার লেখা জানি না;
আমি একবার খুব অসুস্থ হয়ে পড়লাম। ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বললেন অপারেশন করতে হবে। আব্বুরও ব্যবসা লস। টানাটানি চলছে সেই সময় পুরো চিকিৎসার টাকা আম্মা দিলো।
তারও কয়েক বছর পরের কথা গ্রাম থেকে খবর এলো আমাদের জমির পাশের জমি বিক্রি হবে। সব টাকা যোগার করার পর দেখা গেলো আরো আড়াই লক্ষ টাকা শর্ট। হুট করে একসাথে এতোগুলা টাকা কেউ দিতে রাজি হলো না।সেই সময় আম্মা দিলো আড়াই লক্ষ টাকা। সবাই অবাক হয়েছিল কিন্তু সবার আড়ালে আব্বু হেসেছিল। সেই জমি আম্মার নামে কিনলেন।
আমার বিয়ের দিন আমাকে সাজানোর পর আম্মা রুমে এলেন এবং সবাইকে বের করে দিলেন সেখান থেকে। দুটো বালা আমার হাতে পড়িয়ে দিতে দিতে বললেন,'তোমার গুণধর বাপ বহু বার ব্যবসায় লস খাইসে। তার খেসারত দিতে হয়েছে আমাকে। প্রথম বার লস হয় তুমি ভূমিষ্ট হবার পর। সে সময় নিজের ধারদেনা দেওয়ার জন্য সে আমার শখের গয়না গুলো বিক্রি করে। আমি তোমাকে বুকে জড়িয়ে কান্না করেছিলাম।অভিমানে টানা একমাস তোমার গুণধর বাপের সাথে কথা বলি নাই। এরপর ব্যবসায় যখন লাভ হলো তখন তার থেকেও বেশি গয়না আমাকে গড়িয়ে দিয়েছে।
ছোটবেলায় বলতে না, ‘আম্মা তুমি কি আব্বুর পকেট থেকে চুরি করো?’ এই চুরির টাকায় তোমার মা অনেক কিছু করেছে। এই বুদ্ধি তোমার নানু আমায় দিয়েছে। সংসারের মেয়েদের টাকা উড়ালে হবে না। বরং সঞ্চয়ী আর হিসেবি হতে হয়। মানুষের অবস্থান কই থেকে কই চলে যায় বলা তো যায় না। সংসার কিন্তু মেয়েরাই ধরে রাখে। সংসারের উন্নতি আর অবনতি একটা মেয়ের হাতে থাকে। আশা করি তুমিও আমার মতো হবে।'
এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় আব্বুর সাথে বারান্দায় বসে শ্বশুরবাড়ির গল্প করছি। আর আম্মা রান্নাঘরে খিচুড়ি রান্না করছে। গল্পের এক ফাঁকে আব্বু তার মোটা ফ্রেমের চশমাটা চোখ থেকে নামালেন। আর বললেন,'আমার দৃষ্টিতে তোমার আম্মা একজন আদর্শ নারী। ব্যবসায়িক খাতে অভিজ্ঞ হওয়ার পরও অসতর্কতার জন্য আমি বহুবার লস খেয়েছি। তোমার আম্মা আমাকে ততবারই সাপোর্ট করেছে। টানাটানির দিনও গেছে আমাদের তখন তুমি খুব ছোট।
অন্য সব নারী হলে অভাব দেখলে দৌড়ে পালাতো কিন্তু সে আমাকে মেন্টালি সাপোর্ট করে গেছে। আমার পকেট থেকে যে তোমার মা রোজ সকালে টাকা রাখতো এই ব্যপার টা আমি জানি। আমি যে জানি সেটাও তোমার মা জানে। তাইতো সব সময় আমি আমার পকেটে পঞ্চাশ কিংবা একশো টাকা রাখতাম তোমার মায়ের জন্য। তোমার 'মা' আমার পরিপূর্ণতা।
সে না থাকলে কবেই তলিয়ে যেতাম। একজন স্বামীর একজন স্ত্রীর সাপোর্ট পাশে থাকা যে কি বলে বোঝাতে পারবো না। আমি চাইবো তুমিও নিজেকে তোমার মায়ের মতো গড়ে তুলো। যেন তোমার স্বামীও একদিন তোমাকে নিয়ে গর্ব করে। তোমার আম্মাকে আমি মাঝে মাঝে বলি এতো কিছুর পরও আমাকে ছেড়ে কেন গেলে না? তোমার আম্মা কি বলে জানো?'
আমি আব্বুর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম।
তারপর তিনি বললেন,'বলে তোমাকে বিয়ে করেছি তোমার হাড়মাস জ্বালিয়ে খাওয়া না অব্দি তোমার রেহাই নেই।'
বলেই তিনি হু হু করে হাসতে লাগলেন, তৃপ্তির হাসি! সেই হাসিতে ছিলো মনের মতো জীবনসঙ্গী পাওয়ার উপচে পড়া আনন্দ।
Comments
Post a Comment