★একজন প্রতিবাদী নারী★
আমি রুবি, একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরী করি। আমার স্বামী সৈকত যশোরে একটা প্রাইভেট ব্যাংকে আছে। বিয়ের পর থেকে তার কাছ থেকে আমি কোনো অবহেলা পাইনি, অবশ্য ভালোবাসার আদিখ্যেতাও পাইনি,মানুষ টা এমনই। প্রতিবেলায় ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিবে, প্রতি সপ্তাহে বাড়ি চলে আসবে, আমার কাছে এটাই ভালোবাসা । তবে মানুষটা একটু অন্যরকম, রেগে গেলে সেটা ভাষায় প্রকাশ করবে না কিন্তু অন্য কোনভাবে বুঝিয়ে দেবে যে সে আমার উপর রেগে আছে। এই বিষয়টি আমার বুঝতে খুব সমস্যা হয় আমি তো আর জ্যোতিষী না যে সে কি কারণে রেগে আছে এটা জেনে যাব তবুও নিজে থেকে সরি বলে সব মিটমাট করে নেই। এটুকু ছাড়া আর সবই ঠিকঠাক, আমি ভালোই আছি।
দ্বিতীয় রোজার দিন রান্না করতে করতে শাশুড়ি মাকে বললাম,এবারের ঈদটা আমি বাবার বাসায় করবো। বিয়ের পর এই প্রথম বাবার বাড়ি ঈদ করবো বলে মনস্থির করেছি।
-তুমি চলে গেলে এখানকার মেহমান কে সামলাবে?
-মেহমান বলতে তো নীতু আর ওর হাসবেন্ড, ওরা তো ঘরের মানুষ। নীতু আমার ননদ,ওর বিয়ে হয়েছে ছয় বছর ।
-তো তুমি বলতে চাইছো ওদের যত্নের প্রয়োজন নেই? শাশুড়ি মা বলে উঠলেন।
-আপনি তো আছেন মা আর তাছাড়া নীতু তো প্রত্যেক রোজার ঈদ এখানেই করে। আমি কখনোই যাইনা, আমারও তো ইচ্ছে করে বাবা মায়ের সাথে ঈদ করতে।
মা আর কিছু বললেন না, রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। ডাইনিং রুমে বসে সৈকত সবই শুনতে পেল, সেদিন ছিল শুক্রবার।
পরের সপ্তাহে সৈকত বাড়ি এলো না। এমনিতে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জারে আমার সাথে ঠিকঠাক যোগাযোগ আছে। জানতে চাইলাম, কেন আসবেনা উত্তরে পেলাম ইচ্ছে করছে না। বিয়ের পর এই প্রথম কোন একটা শুক্রবার ওকে ছাড়া আমাকে কাটাতে হবে। তবে অন্যবারের মতো আমি বিভ্রান্ত হলাম না, এবারে বুঝে গেলাম ওই যে গত সপ্তাহে শাশুড়ি মায়ের সাথে সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছে সেটার কারণেই এত কিছু, আমি কিছুই বললাম না।
পরের দিন অফিসের একটা ইফতার পার্টি ছিল । আমি যথারীতি সেখানে যোগদান করলাম। দুই একটা ছবিও তোলা হলো। সুন্দর করে সেগুলো সৈকতকে হোয়াটসঅ্যাপ করে দিলাম। তার দুদিন পর অনেক রকম ইফতার বানিয়ে টেবিল সাজিয়ে আমি, আমার ছেলে আর শাশুড়ি মা মিলে ইফতার করলাম। ইফতারের টেবিলেই মায়ের কাছে ফোন এলো সৈকতের।
আমি শুধু এপাশের কথা শুনতে পাচ্ছি...
- হ্যাঁ হ্যাঁ বৌমা অনেক রকম ইফতার তৈরি করেছে আজকে, আচ্ছা তুই রাখ আজান হয়ে যাবে এখনই।
পরের দিন দুই বান্ধবী সহ বেশ কিছু ঈদ শপিং করলাম। ওর ফোন এলে বললাম শপিংয়ে আছি পরে কথা বলছি।
নাহ্ আমি তাকে ইগনোর করিনি শুধু এতোটুকু বোঝাতে চেয়েছি যে তুমি আমার একমাত্র পৃথিবী নও, তুমি যদি অকারণে আমার উপর মেজাজ দেখাতে পারো আমারও অনেক অপশন আছে। তুমি ইগনোর করে যাবে আর আমি বালিশ ভেজাবো সেরকম মেয়ে আমি নই। পরের সপ্তাহে সে যথারীতি এসে উপস্থিত, আমাকে আর কিছুই করতে হয়নি।
তখন বিয়ের একদম পরপর, বিয়ের ছুটি কাটিয়ে অফিসে মাত্র জয়েন করেছি। ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরে ঢাকা শহরের অসহনীয় জ্যাম পার করে বাড়ি পৌঁছলাম। বাড়ি ঢুকতেই শাশুড়ি মা বললেন,' আমাকে এক কাপ চা করে দাও তো।
-আমি হাসিমুখেই বললাম,'একটু ফ্রেশ হয়ে আসি মা, খুব টায়ার্ড লাগছে তারপর করছি।
-আমার মাথা ব্যথা করছে এখন আর তুমি হাতমুখ ধোবে, ফ্রেশ হবে, চেঞ্জ করবে তারপর চা বানাবে, নিজের মা হলে পারতে?
-আমি ব্যাগ রেখে সোফায় বসে গেলাম,চোখে চোখ রেখে বললাম,'আপনার মেয়ে অফিস শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে ফিরলে সঙ্গে সঙ্গে আপনি নিজে কি পারতেন তাকে বলতে আমায় এক কাপ চা বানিয়ে দাও বরং উল্টো নিজে চা বানিয়ে বসে থাকতেন তা কি করেছেন?
নতুন বউয়ের মুখে এ ধরনের কথা শুনে সে হতাশ চোখে তাকিয়ে থাকলো।
এরপর থেকে আমাকে আর এই ধরনের কোন কথা শুনতে হয়নি। তার মানে এই নয় যে উনি আমার জন্য চা বানিয়ে বসে থাকেন। আমি আমার মত করে ফ্রেশ হই তারপর নিজের দায়িত্ব পালন করি।
সৈকতের ধারনা আমি রিভেঞ্জ প্রিয়। হয়তো তাই আবার হয়তোবা না। মাঝে মাঝে প্রিয় মানুষদেরকে বুঝিয়ে দিতে হয় নিজের মূল্যটা।
কাউকে কাউকে শিখিয়ে দিতে হয় কাছের মানুষের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে, কোন কথা কোথায় বলতে হবে। কখন পাশে থাকতে হবে কখন না থাকলেও চলবে। আমি সাধারণ অতি সাধারণ কিন্তু আমি আমাকে ভালবাসি, যদি প্রশ্ন করা হয় আমি কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি উত্তর হবে নিজেকে কারণ যে নিজেকে ভালোবাসতে পারে না নিজের মূল্যায়ন করতে পারে না সে সব জায়গাতেই হোঁচট খেয়ে পড়ে।
গল্পটি আমার নয়, তবে একজন নারীর আর এই গল্পের সাথে মিল যাবে হয়তে অনেক নারীর জীবন। কিন্তু সবাই রুবীর মত নারী হতে পারে না হয়তো তবে যারা এমন প্রতিবাদী নারী হতে পারে তারা সফল নারীতে গন্য হতে পারে।
###
আপনি যদি একজন কর্মজীবী মেয়েকে আপনার জীবনের সঙ্গী হিসেবে বেছে নেন, তবে আপনাকে মেনে নিতে হবে, সে ফুলটাইম আপনার বাড়িতে কাজ করতে পারবে না। আপনি যখন-তখন রোমাঞ্চ পেতে চাইলেও পাবেন না।
আপনি যদি একজন গৃহিণীকে আপনার জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন, তাহলে আপনাকে মেনে নিতে হবে যে, সে আপনাকে আর্থিক ভাবে সহায়তা করতে পারবে না। কিন্তু আপনার ঘরের সব কাজের সাথে যেকোনো সময় আপনাকে হয়তো যথেষ্ট সময় দিতে পারবে।
আপনি যদি একজন স্টাইলিশ কর্মহীন মেয়েকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পেতেচান, তবে তার লাইফ স্টাইলের জন্য ব্যয় নিঃসন্দেহে আপনাকেই করতে হবে। পাশাপাশি ঘরের কাজের জন্য একাধিক গৃহকর্মী আপনাকেই রাখতে হবে।
আপনি একজন সাধারণ মেকআপ এর স্তরে মুখ ঢেকে না রাখা মেয়েকে বিয়ে করেন তবে আপনাকে মেনে নিতে হবে তার মুখের ছোট ছোট ব্রণের দাগ কিংবা কালো ছোপ ছোপ বা ডার্ক সার্কেল ইত্যাদি তা দেখে আপনি কোনদিন তাকে বলতে পারবেন না, তুমি ঐ স্টাইলিশ মেয়ের মত নও!
কাউকে কারো মত বানানো যায়না আসলে। সবাই একটি নিজস্ব সত্তা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। মাটির পুতুল ভেঙে নতুন করে গড়ানো যায়, কিন্তু মানুষ না।
একই শরীরে আপনি কারিনা, জরিনা, মিশেল ওবামা, সিদ্দিকা কবির সবাইকে চাইতে পারেননা।কারণ আপনি নিজেও একই সাথে শাহরুখ খান, বিল গেইটস, টমি মিয়া নন।
Comments
Post a Comment